১২তম অধ্যায়: মেংজু শহরের দশ মাইলের ঢাল (একটু সম্মান চাই)

জলসত্র থেকে শুরু হওয়া বীরের যাত্রা আমি তিনটি নদীর দিকে রওনা হচ্ছি। 2501শব্দ 2026-03-19 13:37:52

পান জিনলিয়ান কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। দুইজনের কথাবার্তা থেমে থেমে চলছিল, পরিবেশটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে গেল। তিনি দেখলেন পরিস্থিতি কিছুটা অস্বস্তিকর, তাই চাও জুনের কাপটিতে আবার চা ঢেলে, চুপচাপ ভিতরের ঘরে চলে গেলেন।

চাও জুন তখন উত্তেজনায় চায়ের কাপ হাতে নিয়ে মনে মনে বারবার বলছিলেন, ‘‘ওহে উ দ্বিতীয় ভাই, আমি তো ভাবির প্রতি বিন্দুমাত্র অশ্রদ্ধা দেখাইনি, দয়া করে আমাকে ভুল বুঝো না।’’

চাও জুন যখন মনে মনে চুপিচুপি বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন, তখন পান জিনলিয়ান হাতে সুই-সুতোর থালা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন।

‘‘কাকা তো একাই নতুন কাজে এসেছেন, সাথে তো কোনো পরিবার নেই। দেখলাম কাকার তো খুব বেশি বদলানোর কাপড়ও নেই। যেহেতু আমিও অলস, তাই ভাবলাম কাকার মাপ নিয়ে রাখি, পরে কাকাকে দু-একটা পরার কাপড় বানিয়ে দেব।’’

এ কথা বলে তিনি কোমরে细绳 জড়িয়ে চাও জুনের মাপ নিতে শুরু করলেন।

দুজনের মধ্যে এই প্রথম এত কাছে আসা, এতটাই কাছে যে একে অপরের নিঃশ্বাসও শোনা যায়। চাও জুনের বুকের ধুকপুকানি যেন থেমে গেল।

তিনি শরীর শক্ত করে, দুই হাত তুলে নিঃশব্দে কাঠপুতুলের মতো পান জিনলিয়ানের ইচ্ছায় নড়াচড়া করলেন না, আর মুখে একটাই কথা, ‘‘ওহে উ দ্বিতীয় ভাই, তুমি কিছু ভেবো না, উনি শুধু আমার মাপ নিচ্ছেন।’’

এই অল্প সময় যেন শতাব্দীর মতো দীর্ঘ মনে হলো।

মাপ নেয়া শেষ হতেই পান জিনলিয়ান চাও জুনের সারা মুখ ঘামে ভেজা দেখে মজা করে বললেন, ‘‘কাকা, কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?’’

চাও জুন বারবার মাথা নেড়ে বললেন, ‘‘না, গরমের জন্যই এভাবে ঘামছি, শরীর ঠিকই আছে।’’

পান জিনলিয়ান আবার বললেন, ‘‘কাকা তো এখন কয়েকদিন হলো ইয়াংগু জেলায় আছেন, কোথায় থাকছেন?’’

‘‘এমনিই জেলা কার্যালয়ের হোস্টেলে রাত কাটাচ্ছি।’’

পান জিনলিয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল, তিনি নরম স্বরে বললেন, ‘‘তাহলে কাকা, বরং আমাদের বাড়িতেই চলে আসুন। সকালে-সন্ধ্যায় গরম খাবার থাকবে, আমি সব ঠিকঠাক করে দেব, কাকাকে কোনো কষ্ট হবে না।’’

‘‘এটা...’’

চাও জুনের কপাল বেয়ে ঠাণ্ডা ঘাম ঝরতে লাগল।

তিনি এতটাই বিচলিত যে মনে হলো, হৃদয়টা গলায় উঠে গেছে; জীবনে প্রথমবার বুঝলেন, নারী জাতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

মনে মনে তখনই নানা অজুহাত খুঁজতে লাগলেন, কীভাবে ফিরিয়ে দেবেন।

ঠিক তখনই বাইরে আচমকা পায়ের শব্দ শোনা গেল, আর উ দা কাঁধে বাঁশের দণ্ড নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন।

তিনি চাও জুন ও পান জিনলিয়ানকে একসাথে দেখে বোকা বোকা হাসলেন, ‘‘তুমি জানো তো, একটু আগে বাড়ি ফেরার সময় সেই ওয়াং পিসি আমাকে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ওর হয়ে একটু কথা বলি, নাকি আদালতে ঝামেলা হয়েছে, এখন কেউ ওর বাড়িতে এসে হাজির।’’

চাও জুন কিছু বলার আগেই পান জিনলিয়ান চাও জুনের পক্ষ নিয়ে বললেন, ‘‘কাকা তো নতুন কাজে এসেছেন, এখনো ঠিকমতো স্থির হননি। এর মধ্যেই কেউ সুপারিশ নিয়ে এলে তো কাকার বড় ক্ষতি হয়ে যাবে।’’

উ দা মাথা চুলকে বারবার বললেন, ‘‘ঠিকই বলেছো, আমিই বেশি নাক গলালাম, কাকা কিছু মনে কোরো না।’’

চাও জুন বুঝলেন, ওয়াং পিসি ফাঁদে পড়েছে, তাই পান জিনলিয়ানের সামনে উ দার মর্যাদা বাড়ানোর জন্য নিরুত্তাপভাবে হাত নেড়ে বললেন, ‘‘এ সব ছোট খাটো বিষয়, কোনো কথাই না। প্রতিবেশী তো, পারলে সাহায্য করাই ভালো, দাদা-ভাবিকে অস্বস্তিতে ফেলতে চাই না।’’

সবাই মিলে কিছুক্ষণ গল্প করলেন, তারপর আবার দোকানের ব্যবসা নিয়ে কথা উঠল। উ দা ও পান জিনলিয়ানের চোখেমুখে আশার আলো ফুটে উঠল, কথার সুরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

তাঁরা চাও জুনকে থেকে মদ খাওয়ার অনুরোধ করলেন, কিন্তু তিনি আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি একটি অজুহাত দেখিয়ে চলে গেলেন।

উ দার বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখতে দুপুর গড়িয়ে গেছে। চাও জুন আগের দিনের পরিকল্পনা মনে করে সঙ্গে সঙ্গে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ছুটি নিয়ে সরাসরি ডাকঘরে গেলেন, দ্রুত একটি ঘোড়া ভাড়া করলেন, আবার মদের দোকানে গিয়ে লাউ ভর্তি ভাল মদ কিনে কোমরে বেঁধে নিলেন।

পথের দিকনির্দেশ জেনে নিয়ে সোজা মেংঝৌর শি লি পো-র দিকে রওনা দিলেন।

তখন নভেম্বরের শুরু, প্রকৃতি ছিল স্নিগ্ধ ও নির্মল।

চাও জুন একা ঘোড়ায় চেপে ছুটলেন, পিপাসা পেলে লাউ খুলে মদের চুমুক দিলেন, খিদে পেলে শুকনো গরুর মাংস খেলেন, রাস্তার মোড়ে কাউকে দেখলে পথে জিজ্ঞেস করলেন।

কখনো থেমে কখনো চলতে চলতে একশো লি পার হয়ে গেল, সূর্য ঢলে পড়ার সময় গন্তব্যে পৌঁছালেন।

শেষের দিকে আর কোনো পথচারী পাওয়া গেল না।

চারপাশে ঘন গাছগাছালি আর উঁচু পাথর ছাড়া আর কিছু নেই, শুধু একফালি আঁকাবাঁকা কাদামাটির পথ, সবুজ জঙ্গলের মধ্যে এলোমেলোভাবে চলে গেছে, মাঝপথে একটিও লোকজন নেই।

‘‘কোথাও ভুল পথে এলাম না তো?’’

চাও জুন একটু দ্বিধায় পড়ে গেলেন।

তিনি ঘোড়া থেকে নেমে শুকনো গাছের ডালে ঘোড়াটা বেঁধে দিলেন, ঘোড়া সেখানে ঘাস খেতে লাগল আর চাও জুন পাশে একটি ঢালে উঠে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করলেন।

চারদিকের দৃশ্য একটু উন্মুক্ত হয়ে এলো।

এখন গোধূলি, আকাশের কিনারে সূর্য ঢলে পড়েছে, অর্ধেকটা সূর্য দিগন্তের নিচে হারিয়ে গেছে, চোখে পড়ে লাল আভায় আগুনের মতো পরিবেশ।

আরো একটু পরেই রাত নামবে।

চাও জুনের মনে উদ্বেগ বাড়তে লাগল।

সূর্যাস্তের শেষ আলোয় তিনি দেখলেন সামনেই এক বড় ঢালু, ঢালুর শেষে একটি তিনমুখী রাস্তার মোড়, সেখানে কয়েকটি খড়ের ঘর বাঁধা, রাস্তার এক পাশের গলিতে।

চাও জুন নিশ্চিত হতে পারলেন না, এটাই কি মূল গল্পের ক্রুশ রোড কিনা।

তবুও, যদি ভুল জায়গাতেও এসে থাকেন, অন্তত রাত কাটানোর জন্য একটা বাড়ি দরকার, পাহাড়ে খোলা আকাশের নিচে থাকাটা ঠিক নয়।

তিনি ঘোড়াটা হাতে নিয়ে অর্ধ কিলোমিটার এগোলেন, বড় ঢালু বেয়ে মাঝপথে উঠতেই সামনে একটা বাঁশের দণ্ড হাতে মধ্যবয়সী মানুষ হেঁটে এলেন, পোশাক দেখে মনে হলো পাহাড়ি কাঠুরে।

চাও জুন ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘ভাই, সামনে কি ক্রুশ রোড?’’

মধ্যবয়সী ব্যক্তি চাও জুনের সরকারি পোশাক দেখে মুখ গম্ভীর করে কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলেন।

চাও জুন চোখ সরু করে লোকটার পিঠের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর কোমরের মদের লাউটা ছুঁয়ে ঘোড়াসহ এগোলেন।

অবশেষে, সন্ধ্যা নামার আগেই খড়ের ঘরের সামনে পৌঁছালেন।

দেখলেন, এই খড়ের ঘরগুলো বাঁ দিক থেকে ডান দিকে প্রায় দশটা মতো, এক পাশে পাহাড়ের ঢালে গড়া, ঘরের সামনে ডালপালা কাটা একটি উইলো গাছ, তার ডালে ‘মদ’ লেখা কাপড়ের ছাউনি ঝুলছে।

‘‘আহা, মনে হচ্ছে এটাই জায়গাটা।’’

চাও জুন নিরুত্তাপ মাথা নাড়লেন, কোনো ফাঁক রাখলেন না, ঘোড়ার লাগাম ভালোভাবে বেঁধে, মদের লাউ হাতে এগিয়ে গেলেন।

কয়েক পা হাঁটতেই দেখলেন, মদের দোকানের একপাশে একটি দরজা খোলা, চৌকাঠে এক মহিলা বসে আছেন, পরনে ঢিলেঢালা সবুজ কাপড়, চুলে মোটা সোনালি কাঁটা, কানের পাশে কিছু অজানা বুনো ফুল গোঁজা।

চাও জুন দেখলেন, মহিলার শরীর ভারী, হাড়গোড় মোটা, মুখে গাঢ় প্রসাধন, বুক খোলা, মুখে কঠিন ভাব, দেখলেই বোঝা যায় সহজে ঘাঁটানোর মানুষ নন।

মনে সাহস নিয়ে চাও জুন ভাবলেন, ‘‘এটাই হবে ঠিক জায়গা।’’

মহিলাও চাও জুনকে দেখে দুই হাত বুকে নিয়ে দরজায় ভর দিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন, ‘‘ওহো, ভাবিনি সন্ধ্যা হয়ে এলো, এখনো অতিথি আসছেন।’’

‘‘ভাই,既然 এসেছেন, ভিতরে এসে একটু বিশ্রাম নিন। আমাদের এখানে চমৎকার মদ-মাংস আছে, রাস্তায় নেয়ার জন্য বড় বড় মাংস ভর্তি ময়দার রুটি আছে, খেয়ে দেখুন, পছন্দ হবেই।’’

চাও জুন দেখলেন, তাঁর দৃষ্টি তাঁর সরকারি পোশাক আর মদের লাউ-এ আটকে গেল। মনে হলো সন্দেহ করছে, তাই তিনি সাদামাটা মদ্যপানের ভঙ্গি করে হেসে উঠলেন, লাউ খুলে এক চুমুকে প্রচুর মদ খেলেন, কোনো সন্দেহ ছাড়াই দোকানে ঢুকে গেলেন।

দোকানে কয়েকটা সোজা কাঠের টেবিল-চেয়ার সাজানো। চাও জুন দরজার কাছে একটা বেছে বসে টেবিলে চাপড় মেরে ডাকলেন, ‘‘মালিকানী, ভালো মদ আর মাংস দাও, খেয়ে টাকা দিয়ে দেব।’’

‘‘আসছি, ভাই, এখানকার তাজা রুটিও আছে।’’

‘‘রুটি যখন আছে, দশটা দাও, না খেলে বাকিটা পুঁটলি করে নেব।’