নবম অধ্যায় — আকস্মিক সাক্ষাৎ
অনুগ্রহ করে সবাই আমার উপন্যাসটি সংগ্রহে রাখুন, ভোট দিন!
টানা দুই দিন ধরে বাবা আর বড় ভাই কোনো শিকার পায়নি। তৃতীয় দিনে গিয়ে তারা একটি বুনো মুরগি আর দুটো খরগোশ মেরেছিল। এই তিনদিনে লো সিনও ছত্রিশটি পাহাড়ি চড়ুই ধরেছিল। চতুর্থ দিনে, দুই ভাই আবারো বরফ ঢাকা পথ পেরিয়ে শহরের দিকে রওনা দিল।
শহরে ঢুকে খরগোশ ও মুরগি বেশ সহজেই বিক্রি হয়ে গেল, কিন্তু চড়ুইয়ের জন্য কোনো দোকানদার আগ্রহ দেখাল না। কারণ সম্প্রতি কিছু বেকার লোক জাল পেতে পাখি ধরছে, তাদের শিকার এত বেশি হচ্ছে যে, শহরের রেস্তোরাঁগুলো আর পাহাড়ি চড়ুই কিনছে না।
এতে লো সিন হতবাক হয়ে গেল। এত কষ্ট করে তিনদিন ধরে ঠকতে ঠকতে সবই বৃথা হলো। দুই ভাইয়ের আর খিদেও রইল না, চুপচাপ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে লাগল।
ঠিক তখনই, ওপার থেকে এক গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘‘ছোটভাই, এই চড়ুইগুলো কি বিক্রি করবে?’’
লো সিন তাকিয়ে দেখল, একজন বৃদ্ধ, পোশাক-আসাকে বেশ সম্ভ্রান্ত, সম্ভবত কোনো জমিদারের বাড়ির ম্যানেজার। সে তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল, ‘‘হ্যাঁ, চাচা, আপনি কি এই চড়ুইগুলো নিতে চান?’’
‘‘হুঁ, আমার সঙ্গে এসো।’’
বৃদ্ধ সামনে এগিয়ে যেতে লাগলেন, দুই ভাই খুশিমনে তার পেছনে চলল। প্রায় পাঁচশো কদম হেঁটে তারা এক বাড়ির গেটে পৌঁছল। বৃদ্ধের সঙ্গে ভিতরে ঢুকে চারপাশে নজর বোলাল লো সিন। বাড়িটি খুব বড় নয়, তবে সাজানো-গোছানো, যেন শিক্ষিত কারও বাসা।
‘‘এই বাড়ির লোকজন বুঝি খুব সাধারণ নয়!’’ মনে মনে ভাবল লো সিন। তখনই বৃদ্ধ বলল, ‘‘চড়ুইগুলো আমাকে দাও, তোমরা দু’জন এখানে দাঁড়িয়ে থাকো।’’
‘‘ঠিক আছে!’’
বাড়ির পরিবেশ দেখে লো সিন নিশ্চিন্তে চড়ুইগুলো বৃদ্ধের হাতে দিল। বৃদ্ধ ভেতরে চলে গেলেন। তখন আঙিনায় গেটরক্ষী এক বৃদ্ধ ছাড়া আর কেউ নেই। দুই ভাই কোণের একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে বাতাস থেকে বাঁচার চেষ্টা করল। লো সিন আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, ‘‘দাদা, তুমি কি এই বাড়ির কথা জানো?’’
‘‘না।’’
এই সময় হঠাৎ রুপার ঘণ্টার মতো হাসির শব্দ শোনা গেল, শীতের আকাশে সেটা যেন বেজে উঠল।
‘‘জুয়ান দিদি, তুমি একদম আমার মতো এঁকেছো! ধন্যবাদ!’’
মোড় ঘুরতেই দুই বালিকা সামনে দেখা দিল, তাদের পেছনে দু’জন চাকর। একজন পাঁচ-ছয় বছরের, আরেকজন এগারো-বারো বছরের। দুজনেই ছোটখাটো গড়ন, শীতের পোশাক পরলেও মোটেই ভারী দেখায় না। মাথায় ডাবল খোঁপা, ছোট মেয়েটি হাঁটতে হাঁটতে দুই হাতে একটা কাগজ ধরে আছে, আনন্দে চোখ মুখ উজ্জ্বল, বরফে লাল হয়ে যাওয়া হাতের তোয়াক্কা নেই। একটু বড় মেয়েটির মুখে গর্ব, তবে ছোটটির দিকে তার দৃষ্টিতে মায়ার আভাস।
লো সিন ও তার দাদা চুপচাপ দাঁড়িয়ে। জানে, বড়লোকের বাড়ি, এখানে বাড়তি কৌতূহল দেখানো বিপজ্জনক।
কথা বলতে বলতে দুই বালিকা মোড় ঘুরতেই দুই অচেনা ছোকরা দেখে চমকে ওঠে। ছোট মেয়েটির হাত থেকে কাগজটা মাটিতে পড়ে যায়, ঠিক লো ছিংয়ের পায়ের সামনে। চমকে গিয়ে ছিংয়ের পা পিছলে কাগজের এক কোণে চেপে বসে।
‘‘তোমরা কারা?’’ পেছনের দুই চাকর চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘বড় সাহস তোমাদের, আমাদের মিসকে ধাক্কা দাও!’’
‘‘না! না!’’ লো ছিং হাত নেড়ে ঘাবড়ে গেল।
লো সিন কিন্তু শান্ত থেকে দৃঢ়ভাবে মেয়েদের দিকে তাকাল। ছোট মেয়েটির মুখ লজ্জায় লাল, চোখে জল টলমল। লো সিন তার তাকানো অনুসরণ করে দেখল, বড় ভাইয়ের পায়ের অর্ধেক কাগজের ওপর চেপে আছে। কাগজে ছোট একটি মেয়ের ছবি, দেখতে অনেকটা সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মতো।
‘‘বিপদ!’’
লো সিন চুপিচুপি দাদাকে পিছন দিকে টেনে নিল। ছিং এক পা পিছিয়ে এলো। কাগজে কালো ময়লা পায়ের ছাপ পড়ে গেছে, ছবির গায়ে না লাগলেও ফাঁকা জায়গায় দাগ লেগেছে, মানে ছবিটা নষ্টই হলো। কেউ নিজের ছবি এভাবে দাগ লাগলে তো আর রাখবে না।
ছোট মেয়ে কাগজটা কুড়িয়ে নিল, তখনই কাঁদতে শুরু করল। পাশে এগারো-বারো বছরের মেয়ের ভুরু কুঁচকে উঠল, সে লো ছিংয়ের দিকে আঙুল তুলে রাগে বলল, ‘‘কোথাকার কুলাঙ্গার, আমার আঁকা নষ্ট করেছিস, ওকে মারো!’’
লো সিন সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেল, এই ছবি এঁকেছে বড় মেয়েটি, আর ছবির মডেল ছোটটি। সে কিছু বলার আগেই দুই চাকর এসে দুই ভাইয়ের গালে চড় মারতে উদ্যত। লো ছিং তো ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকল, লো সিন কিন্তু সহজে ছাড়বে না। সে দাদাকে টেনে সরিয়ে নিল, ছিং পিছিয়ে গিয়ে এক চাকরের চড় এড়িয়ে গেল, লো সিন মাথা নিচু করলে বাতাস কেটে চড়টা উড়ে গেল।
দুই ভাই বয়সে ছোট হলেও শিশুকাল থেকেই শরীরচর্চা করে, সত্যি যদি মারপিটে নামত, এই বিশ বছরের চাকরদের ঘায়েল করত। তবে লো সিন জানে, এ বাড়িতে গোলমাল করলে বিপদ হবে। দুই ভাই এই দুজনকে সামলালেও আরও চাকর এসে পড়বে। তাই সে জোরে বলল, ‘‘আমরা ক্ষতিপূরণ দেব!’’
‘‘তোমরা কি পারবে?’’ বড় মেয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘‘এই ছবি আঁকতে আমার দু’ঘণ্টা লেগেছে, কিসে ক্ষতিপূরণ দেবে? টাকা দিয়ে? আমি টাকার জন্য করি?’’
চাকর দু’জন মিসের ধমক শুনে থেমে গেল। মেয়ে আবার চেঁচিয়ে উঠল, ‘‘থেমে গেলে কেন? মারো!’’
‘‘একটু দাঁড়ান!’’ লো সিন হাত তুলে থামিয়ে দ্রুত বলল, ‘‘আমি আঁকব, আমি নতুন একটা এঁকে দেব।’’
মাটিতে বসে থাকা ছোট মেয়ে শুনে অবাক হয়ে তাকাল, তার চোখে বিস্ময়।
‘‘আরে! তুমি!’’
চাকরদ্বয় থেমে গেল। লো সিন এবার ছোট মেয়েটির মুখ ভালো করে দেখল, যেন কোথায় দেখেছে। সে হাসিমুখে হাতজোড় করে বলল, ‘‘আপনি—?’’
‘‘তুমি চিনতে পারো না?’’ ছোট মেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে উৎসাহে বলল, ‘‘মাও তিয়েমাও...’’
এতেই লো সিন মনে করতে পারল, প্রথমবার শহরে চড়ুই বিক্রি করতে এসে, এক হোটেলে এক যুবক পণ্ডিতের সঙ্গে এই মেয়েটির সাক্ষাৎ হয়েছিল। মেয়েটি মুখে উচ্ছ্বাস দেখে সে মনে মনে স্বস্তি পেল, ভাবল, তার মনে আমার সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে নিশ্চয়ই।
কিন্তু সে ‘‘মাও তিয়েমাও’’ বলা মাত্র লো সিন একটু অস্বস্তি বোধ করল, তাড়াতাড়ি বলল, ‘‘মিস, আমার দাদার ভুলে ছবিটা নষ্ট হয়েছে, আমি আপনাকে নতুন একটা ছবি এঁকে দেব, এটাকেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিন।’’
অনুগ্রহ করে সবাই আমার উপন্যাসটি সংগ্রহে রাখুন, ভোট দিন!