৩৩তম অধ্যায়: যাকে পাওয়া যায় না, তারই দোষ খোঁজা
বিশেষ করে তার সেই চোখের কোণ কিছুটা উঁচু, পাতলা বাঁশপাতার মতো চোখের কথা বলতে হয়, যেগুলো সবসময়ই আকর্ষণীয় দীপ্তিতে ঝিলমিল করে, হাসলে তো আরও বেশি। এমন সুন্দর চোখে এক ধরনের আকর্ষণীয় আবেগের ছোঁয়া থাকে, যেন দারুণ মোহময়।
জোইচু কোনো উত্তর দিল না, ইয়াও ফেইয়ের মতো মানুষের সঙ্গে ওর অনেকবার দেখা হয়েছে। এত কষ্ট করে এসব করা—শেষ পর্যন্ত তো নিজের মনোযোগ আকর্ষণ করাটাই উদ্দেশ্য। ইয়াও ফেইয়ের কথায় সাড়া দিলেই বরং ওর জয় হয়ে যাবে।
এই মুহূর্তে জোইচুর একদমই ইচ্ছা নেই এইসব ফালতু কথা বলার, সে নিচু হয়ে আবার প্রশ্নপত্র উল্টাতে লাগল।
কাও জেউইর হাতে ইয়াও ফেইয়ের দিকে তথ্য দিতেই যাচ্ছিল, এমন সময় ইয়াও ফেইয়ের কথা শুনে তার মুখ কালো হয়ে গেল। ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে সে বলল, ‘‘যে ফল পায় না, সে-ই বলে ফল টক। আমাদের ক্লাসে কে না জানে, তুমি তো আগে ভীষণই পছন্দ করতে বো জিংজেকে। এখন মানুষটা আবার একা হয়ে গেছে, তোমার তো সেই সাহস বা যোগ্যতাই নেই গিয়ে কাছে যাওয়ার, তাই এখানে মুখে মুখে দুটো কথা বলে শান্তি পেতে চাইছ।’’
কাও জেউইর কথায় ইয়াও ফেইয়ের মুখ সঙ্গে সঙ্গে সবুজ হয়ে গেল, ‘‘তুমি! কে বলতে পারে ফল না পেয়ে ফল টক বলি? আমি তো শুধু সত্যিই বলেছি!’’
কাও জেউই হেসে বলল, ‘‘তুমি কি তার বাড়ির খাটের নিচে লুকিয়ে ছিলে? না হলে এত সব জানো কী করে?’’
কঠোর একটা শব্দে জোইচু কলম নামিয়ে দিল, কাও জেউইর দিকে তাকাল, ভ্রু কুঁচকে গেল, সুন্দর মুখে বিরক্তির ছাপ, ‘‘এত ঝগড়া করছ কেন!’’
দেবীর মতো মেয়েটি মুখ খুলতেই কাও জেউই চুপ করে গেল, মৃদু হাসি দিয়ে বলল, ‘‘ঠিক আছে, আমি আর কিছু বলছি না।’’
ইয়াও ফেইয়ের হাতে মুঠো আঁটসাঁট, ক্ষোভে জোইচুর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে ঘৃণার আগুন আরও জ্বলতে লাগল।
জোইচু, তুই দারুণ চালাক দেখছি, ফিরে এসেই দ্বিতীয় দিনেই কাও জেউইকে নিজের পক্ষে টেনে নিয়েছিস!
*
ইউহে ইচং স্কুলে ছুটি হয় একটু আগে, বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীই থেকে যায় রাতের বাড়তি পড়ার জন্য, বিশেষত দ্বাদশ শ্রেণিরা। অবশ্য এই ‘বেশিরভাগে’ জোইচু নেই।
ছুটি হলে ড্রাইভার এসে জোইচুকে নিতে আসে, সে স্পষ্ট বলে দেয়, আজ রাতে ইইইউয়ানে ফিরছে না। ড্রাইভার বার বার জানতে চায় সে কোথায় যাবে, কিছুই জানায় না, শুধু তার সামনেই ট্যাক্সিচালককে বলে গাড়ি যেন জো পরিবারের দিকে নেয়।
গত রাতে বো সিচেন ওর সঙ্গে যেমন ব্যবহার করেছে, স্বাভাবিকভাবেই ওর অধিকার আছে রাগ করে বাড়ি না ফেরার।
*
জো পরিবার
জৌ দিদি জোইচুকে ফিরতে দেখে অবাক হয়ে গেলেন। হাসিমুখে বললেন, ‘‘মিস্, আপনি হঠাৎ ফিরে এলেন?’’
বো সিচেন সেই কুকুরটা জোর করে ওকে নিজের সঙ্গে থাকতে বাধ্য করেও ছাড়ল না, আবার জোর করেই ইইইউয়ানে থাকতে বাধ্য করল। তাই বাধ্য হয়ে জোইচুকে ওখানে থাকতে হয়েছে, বেশিরভাগ সময় আর বাড়ি ফেরা হয়নি। এতদিন পর বাড়ি ফিরে, জোইচুর মনে যেন অজানা এক অচেনা অনুভূতি।
‘‘ঘুরে দেখতে এলাম,’’ শান্ত গলায় বলল সে, ‘‘বাবা কোথায়?’’
জৌ দিদি ওকে এক গ্লাস জল দিলেন, ‘‘স্যার তো আজকাল কাজে ব্যস্ত, ঘরে খুব একটা আসেন না। যেহেতু আপনি ফিরেছেন, থাকুন, খেয়ে যাবেন। আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলে নিই।’’
জোইচু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। অবশেষে জো হংইউয়ান ফিরলেই সে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে পারবে। সে ঘুরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।
সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে শুনতে পেল, পাশের গেমরুম থেকে মাহজং খেলার আওয়াজ আসছে।
চমৎকার চেহারার এক মহিলা বললেন, ‘‘গতবারের পরীক্ষায় শুনলাম, ওয়ানওয়ান আবার ফুল মার্কস পেয়েছে! এভাবে চললে তো নিঃসন্দেহে ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবেই।’’
আরেকজন সায় দিল, ‘‘ঠিক বলেছ, জো ম্যাডাম তো বড় ভাগ্যবতী, ওয়ানওয়ানের মতো ভালো মেয়ে পেয়েছেন। ফল ভালো, দেখতে সুন্দর, কথাবার্তা ভদ্র—আমি তো ভীষণ ঈর্ষা করি।’’
তাও মিনের মুখে ও চোখে গর্বের ছাপ স্পষ্ট, দেহও যেন আরো সোজা হয়ে উঠল।
তবু লোকসমাজে যথেষ্ট বিনয় দেখালেন, একদম অভিজাত গৃহিণীর মতোই। একটি টাইল ফেলে হেসে বললেন, ‘‘কোথায় কী, সবই ওয়ানওয়ানের ভাগ্য! ইম্পেরিয়াল ইউনিভার্সিটি নিয়ে আমি ভাবিই না। এই সময়ে এসে আমরা মা-বাবারা তো আর অত চাপ দিতে পারি না।
ভর্তি হতে পারলে ভালো, না পারলেও কোনো জোরাজুরি নেই।’’