অধ্যায় ১১ সাদা মাংসের মুরগির যুবক

আমি অসুস্থ হৃদয়ের সম্রাটের মাধ্যমে সৌভাগ্যের প্রতীক হয়ে উঠলাম। স্বচ্ছ জলের কোনো রং নেই। 2701শব্দ 2026-03-18 23:33:35

মৌপীচ কনিষ্ঠ প্রভুর দুই হাতের নাড়ি পরীক্ষা করলেন, তারপর তাঁর সুন্দর ছোট ভ্রু সামান্য কুঁচকে উঠল।
নাড়ির ছন্দে কোনো অসুস্থতার লক্ষণ নেই, কিন্তু তাঁর দেহের পাঁচটি মূল অঙ্গ এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন নিস্তেজ, যেন একশ বছরের বৃদ্ধের মতো দুর্বলতা ও প্রাণহীনতা নিয়ে ভুগছে, যা সাধারণ আশি-নব্বই বছরের বৃদ্ধের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের চেয়েও দুর্বল।
বাই হাও ইউ উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘ছোট চিকিৎসক, আমাদের প্রভুর অবস্থা কেমন?’’
‘‘তিনি কি বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছেন?’’
‘‘হ্যাঁ। ছোটবেলায় তেমন খারাপ ছিল না, কিছুটা দুর্বল হলেও সতর্ক থাকলে দৈনন্দিন কাজে অসুবিধা হয়নি, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অবস্থা খারাপ হয়েছে। এখন তো কয়েক মিনিট হাঁটলেই শ্বাসকষ্টে প্রাণপ্রায় অবস্থা হয়।’’
কনিষ্ঠ প্রভু বললেন, ‘‘তুমিই তো প্রাণত্যাগ করতে যাচ্ছো!’’
বাই হাও ইউ চুপ করে গেলেন।
মৌপীচ মাথা নাড়লেন, ‘‘তাঁর দেহে প্রাণশক্তি এক শতবর্ষীয় বৃদ্ধের মতো, ঢিলে ঢালা অবস্থায় টিকে আছে।’’
বাই হাও ইউ ও গৃহপরিচারক দুজনেই ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে একই সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তাহলে এখন কী হবে?’’
‘‘আমি প্রথমে তাঁকে আকুপাংচার করব। দেখি অঙ্গগুলো আবার সক্রিয় করা যায় কিনা, নতুন করে প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনা যায় কিনা।’’
যদি উপযুক্ত বাহ্যিক শক্তি প্রয়োগ করা যায়, মানবদেহের আত্মনিরাময় ও স্বনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মানুষের কল্পনারও বাইরে।
তাঁর এই প্রাচীন পুনরুজ্জীবন কৌশল যদি প্রভুর মূল প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনতে না-ও পারে, তারপরও শরীরের কোনো ক্ষতি হবে না।
বাই হাও ইউ দ্রুত জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘তাহলে আমাদের কী প্রস্তুতি নিতে হবে?’’
‘‘তাঁর পোশাক খুলে দিন, এটাই যথেষ্ট।’’
বাই হাও ইউ থমকে গেলেন—এটা করা সাহস হবে না!
কনিষ্ঠ প্রভু পরে হিসেব কষে প্রতিশোধ নিতে ওস্তাদ।
গৃহপরিচারকও ভীত—এটা চলবে না!
কনিষ্ঠ প্রভু নিজেই তার পেশির অভাব নিয়ে সচেতন, আট খণ্ড পেশি না থাকায় নিজেকে যথেষ্ট পুরুষালি মনে করেন না, তিনি গোসলের পরও আগে স্নানচাদর পরে তবেই বাথরুম থেকে বের হন, অন্য কাউকে নিজের বক্ষ দেখাতেও রাজি নন।
দেহরক্ষীরা বিস্ময়ে আঁতকে উঠল!
প্রভু তাদের সুঠাম গঠনের জন্য আগেই ঈর্ষান্বিত, জনসমক্ষে নিজের ফ্যাকাশে দেহ প্রকাশিত হলে শুধু ঈর্ষা নয়, আরও খারাপ কিছুই হবে!
অত্যন্ত গুরুতর হলে এমনও হতে পারে যে তিনি কেবল খেতে দিতে দেবেন, ব্যায়াম করতে দিবেন না, তাদের সবাইকে নয় মাসের গর্ভবতী পেট বানিয়ে ছাড়বেন যাতে তার আত্মা শান্ত হয়!
মৌপীচ নিচু হয়ে ছোট ওষুধের বাক্স থেকে বিশেষ সূঁচের একটি প্যাঁচ খুললেন, মেলে ধরতেই ঝকঝকে সোনালী সূঁচের সারি সবার চোখের সামনে উদ্ভাসিত হলো।
কনিষ্ঠ প্রভু দেখে আতঙ্কে কেঁপে উঠলেন।
‘‘ছোট মেয়ে, তুমি আমাকে সূঁচ দিয়ে ফোটাতে পারবে না!’’
মৌপীচ মোটেও পাত্তা দিলেন না, বরং বাই হাও ইউ ও গৃহপরিচারকের দিকে তাকালেন, যেন অবাক হয়ে ভাবলেন, কেন তারা প্রভুর পোশাক খুলে দিচ্ছে না।
‘‘এ... ছোট চিকিৎসক, আমরা কি তাঁকে তাঁর ঘরে নিয়ে আকুপাংচার করতে পারি?’’ বাই হাও ইউ সাবধানে জিজ্ঞাসা করলেন।
‘‘না, এখানকার আবহাওয়াই উপযুক্ত।’’
এয়ারকন্ডিশনের যত উপযুক্তই হোক, প্রকৃতির আবহাওয়ার তুলনা হয় না।
মৌপীচ আর কারও জন্য অপেক্ষা না করে নিজেই কনিষ্ঠ প্রভুর উপরের পোশাক খুলে ফেললেন।
তাঁর ত্বক যেন অতি শুভ্র ও মসৃণ, যা বড় ঘরের অভিজাত তরুণীদের তুলনায়ও বেশি উজ্জ্বল।
কনিষ্ঠ প্রভু রাগে ফেটে পড়লেন, ‘‘তোমার এত সাহস কিভাবে! ছেলেদের পোশাক খুলে দাও! কোনোদিন স্কুলে যাওনি? শিখোনি, অন্যায় দেখবে না?’’
কনিষ্ঠ প্রভু নিজের পেট ঢাকতে চাইলেন, কিন্তু নড়াচড়া করতে পারলেন না, শুধু মৌপীচের দিকে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে চিৎকার করলেন।

উঁহু... এখন তো সবাই জেনে গেল যে তাঁর পেটের পেশি নেই!
মৌপীচ অকপটে বললেন, ‘‘আমি কোনোদিন স্কুলে যাইনি।’’
প্রভু থমকে গেলেন।
‘‘তুমি সত্যিই কোনোদিন স্কুলে যাওনি? এমনকি নয় বছরের বাধ্যতামূলক শিক্ষা-ও পাওনি?’’
তিনি নিজেও অন্তত কয়েক বছর স্কুলে ছিলেন, পাঁচ বছর বয়সে অসুস্থ হওয়ার আগে এবং অসুস্থ হওয়ার পরের ক’টি বছর। তখন অসুস্থতা তেমন গুরুতর ছিল না।
‘‘না, যাইনি।’’
‘‘তুমি পড়তে পারো? পড়তে না পারলে শিখলে কীভাবে? তোমাদের গ্রামে কোনো স্কুলই নেই?’’
তাদের ইয়ানহুয়াং দেশ হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে বিশ্ববিখ্যাত, সেখানে কীভাবে কোনো স্কুল না-থাকা সম্ভব?
নিশ্চয়ই ওখানকার গ্রামপ্রধান অযোগ্য!
কনিষ্ঠ প্রভু কয়েক সেকেন্ড মনোসংযোগ হারালেন, তারপর আবার মৌপীচের দিকে মনোযোগ দিলেন।
সেই অপূর্ব সৌন্দর্যের দানফেং চোখ দুটো সামান্য কটমট করে উঠল, ‘‘তাই তো, তুমি স্কুলে যাওনি বলেই ছেলেদের পোশাক খুলে দিতে পারো। লজ্জা কি, সম্মান কি বোঝো না।’’
মৌপীচ সরাসরি তাঁর বাকশক্তি বন্ধ করে দিলেন।
এ কেমন প্রভু—অত্যন্ত বকবক! তাঁর গুরুদাদার মতোই!
গুরুদাদার প্রতি তাঁর কোনো অভিযোগ নেই, কিন্তু এই প্রভু তো তাঁর কেউ নন, কেন তিনি ওকে সহ্য করবেন!
কনিষ্ঠ প্রভু নড়তে বা কথা বলতে পারলেন না, শুধু চোখ মেলে দেখলেন তাঁর গায়ে সূঁচের সংখ্যা বাড়ছে, তিনি যেন এক জীবন্ত ক্যাকটাস।
মৌপীচ মনোযোগ দিয়ে সূঁচ ফুটাতে লাগলেন, কনিষ্ঠ প্রভুর বুক, পিঠ ও মাথায় মোট ১০৮টি সোনালী সূঁচ ফুটানোর পর থামলেন।
খেয়াল করলে দেখা যায়, প্রতিটি সূঁচ সামান্য কাঁপছে।
চেং আননোর মনে গভীর বিস্ময়।
‘‘ছোট শিষ্যপিসি, এটা কেমন সূঁচবিদ্যা? দেখলে তো একেবারেই আশ্চর্য লাগে!’’
‘‘প্রাচীন পুনরুজ্জীবন কৌশল।’’
‘‘পুনরুজ্জীবন কৌশল! অর্থাৎ শুকিয়ে যাওয়া বৃক্ষে নতুন পাতার মতো প্রাণ ফিরিয়ে দেয়? বার্ধক্য রোধ করে?’’
‘‘হ্যাঁ, শুকিয়ে যাওয়া বৃক্ষে নতুন প্রাণের জাগরণ ঘটায়, বার্ধক্যও বিলম্বিত করে।’’
‘‘তাহলে গুরুজ্যেষ্ঠ ও সিয়াহৌ দাদু আরও তরুণ দেখাচ্ছেন কি এই কৌশলের কারণে?’’
গুরুজ্যেষ্ঠ ও সিয়াহৌ দাদু দুজনেই আশির কোঠায়, অথচ তাঁদের চেহারা চেং আননোর পঞ্চাশোর্ধ্ব বাবার চেয়ে খুব বেশি বুড়ো নয়।
‘‘হ্যাঁ।’’
‘‘শিষ্যপিসি, আমি কি শিখতে পারি?’’ চেং আননো উত্তেজিত।
‘‘তুমি শিখলেও কাজে লাগবে না, কারণ এতে অভ্যন্তরীণ শক্তি দরকার।’’
চেং আননো হতাশ!
এখন থেকে প্রাচীন যুদ্ধবিদ্যা শিখলে কি সময়মতো পারবো? না কি পড়াশোনা ছেড়ে টাওইয়ুয়ান গ্রামে গিয়ে সিয়াহৌ দাদুর শিষ্য হবো?
শিষ্য-শিষ্যপিসি’র এই কথোপকথন শুনে ডাক্তার বাই হাও ইউ আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
নিজের প্রভুর গায়ে সূঁচ ফোটানো বিন্দু ও গভীরতা খুব কাছ থেকে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।

‘‘ছোট চিকিৎসক, এই কৌশল ব্যবহার করতে হলে কি অভ্যন্তরীণ শক্তি জরুরি?’’
‘‘অবশ্যই।’’ কারণ অভ্যন্তরীণ শক্তি ছাড়া তাঁর গুরুদাদা শিখেও ব্যবহার করতে পারতেন না।
সময় মেপে মৌপীচ শেষের ৯টি সূঁচ আগে তুলে নিলেন।
৯ মিনিট পর আকুপাংচারের বিপরীতক্রমে একে একে ৯৯টি সূঁচ তুলে ফেললেন।
বাই হাও ইউ জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘ছোট চিকিৎসক, অন্যান্য সূঁচবিদ্যার তুলনায় এর তুলনা আলাদা মনে হচ্ছে।’
‘‘হ্যাঁ। পুনরুজ্জীবন কৌশলে শেষের ৯টি সূঁচ আগে তুলতে হয়, যাতে জাগ্রত প্রাণশক্তি সংরক্ষিত থাকে।’’
‘‘যদি কেউ প্রথমে কোনটা ফুটিয়েছিল ভুলে গিয়ে ভুল সূঁচ তুলে ফেলে?’’
‘‘তাহলে মৃত্যু অবধারিত।’’
বাই হাও ইউ আতঙ্কে পেছনে সরে গেলেন, যেন কোনোভাবে ভুল করে সূঁচ পড়ে গেলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
এরপর আর একটি শব্দও করলেন না, ভয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন, যদি ছোট চিকিৎসক ভুল করেন এই ভয়ে।
সব সূঁচ তুলে ফেলে মৌপীচ আবার কনিষ্ঠ প্রভুর নাড়ি পরীক্ষা করলেন।
ফলাফল সামান্য হলেও কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তাঁর মনে আশার সঞ্চার হলো।
‘‘ছোট চিকিৎসক, কেমন হলো? কিছু উপকার হয়েছে?’’
‘‘সামান্য হলেও হয়েছে।’’
গৃহপরিচারক আনন্দময় কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘ছোট চিকিৎসক, এই পদ্ধতিতে কি আমার প্রভু পুরোপুরি সুস্থ হবেন?’’
‘‘প্রতি রোববার এই সময়ে আমি এসে চিকিৎসা করব। এক মাস পরে ফলাফল দেখে আরও পরিবর্তন করব।’’
‘‘বাহ বাহ! আশা থাকলেই হলো!’’ গৃহপরিচারক আনন্দে কেঁদে ফেললেন। অবশেষে রাজধানীতে ভালো খবর পাঠানোর সুযোগ মিলল!
বাই হাও ইউ’র চোখে ভক্তি ফুটে উঠল, ‘‘ছোট চিকিৎসক, এই সূঁচবিদ্যা কি আপনারই উদ্ভাবন?’’
তিনি জানেন, বয়স কোনো মানদণ্ড নয়, কারও কম বয়স মানেই তার কৃতিত্ব কম—এমনটা নয়।
কিছু মানুষ সত্যিই অসাধারণ প্রতিভাধর, শতকরা নিরানব্বই ভাগ চেষ্টা করেও অন্যের এক শতাংশ প্রতিভার সমানও হয় না।
‘‘আনুমানিক তাই।’’ আসলে এটি তাঁর পূর্বজন্মের গুরুদাদার উদ্ভাবন, কিন্তু সে কথা বলার উপায় নেই।
‘‘তাই তো, আগের মূল চিকিৎসক এই পদ্ধতি ব্যবহার করেননি।’’
‘‘আমার গুরুদাদার অভ্যন্তরীণ শক্তি নেই।’’
মৌপীচ সূঁচ গুছিয়ে নিলেন, কাগজ ও কলম বের করে প্রেসক্রিপশন লিখলেন।
শেষে ওষুধের বাক্স গুছিয়ে শিষ্যকে ডাক দিলেন।
বাই হাও ইউ মনে করিয়ে দিলেন, ‘‘ছোট চিকিৎসক, আমার প্রভু এখনও নড়তে পারছেন না।’’
‘‘আধাঘণ্টা পরেই তাঁর শিরা খুলে যাবে। আপাতত এভাবেই থাকুক, পোশাক পরানোর দরকার নেই।’’ অবাধ্য ইঁদুরকে এভাবেই শাস্তি দিতে হয়!
‘‘...ঠিক আছে।’’