একবিংশ অধ্যায়: সমগ্র সভায় ত্রাসের ছায়া

ঈশ্বরভক্ষী রক্তপরম্পরা স্মৃতির পতন 2499শব্দ 2026-03-19 04:10:38

প্রাঙ্গণে, উনিশটি ছায়া উনিশটি ভিন্ন দিক থেকে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ল মোরিনের দিকে, তাদের শরীর থেকে হত্যার নেশা যেন আকাশ ছুঁয়েছে, কেউই সামান্যতম দয়া দেখাল না। সবাই চায় এক নিমিষেই মোরিনকে চিরতরে শেষ করে দিতে।

তবুও মোরিন নির্বিকারভাবে ঠিক আগের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল, তার মধ্যে বিন্দুমাত্র অস্থিরতা দেখা গেল না, এমনকি মুখাবয়বেও কোনো পরিবর্তন নেই। অন্য কারো জায়গায় হঠাৎ উনিশজন ঘিরে আক্রমণ করলে সে নিশ্চয়ই চমকে উঠে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ত। কিন্তু মোরিনের মধ্যে ছিল না কোনো ভয়, কেননা গত তিন বছরে এমন পরিস্থিতি সে কতবার যে অতিক্রম করেছে, তার হিসেব নেই!

একটি রহস্যময় হাসি মোরিনের ঠোঁটে ফুটে উঠল। প্রাঙ্গণের আসনে বসা সকল দর্শকের দৃষ্টি তখন শুধু মোরিনের দিকেই নিবদ্ধ, ফলে তার হাসি কারো চোখ এড়ায়নি।

‘‘ও পাগল, একেবারে পাগল ছেলে!’’, তোনি উপহাস করে বলল।

‘‘হুঁ, সে আসলেই নির্বোধ হোক বা অভিনয় করুক, এবার তার মৃত্যু নিশ্চিত!’’ লুকা ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে বলল। সে নিজে পাঁচতলা যোদ্ধা, তাই খুব সহজেই বুঝতে পারল উনিশজন একযোগে প্রাণপণ চেষ্টা করছে মোরিনকে মেরে ফেলার জন্য। মোরিনের মতো নগণ্য একজন এখানে মরলেও কারো কিছু যায় আসে না। ক্লিফের কাছে এ খবর পৌঁছাবে, এমন আশঙ্কা তার নেই।

আরও কাছে, আরও কাছে এগিয়ে আসছে ওরা। মোরিন পায়ের নিচে মাটির প্রবল কম্পন স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারল। এখন ওরা মোরিনের একদম কাছাকাছি চলে এসেছে।

‘‘লুকা, আজ তোকে বলেই দিই, এ সব অকর্মণ্য দিয়ে আমাকে কাবু করা যায় না!’’

মোরিনের দৃষ্টি হঠাৎ বজ্রের মতো তীক্ষ্ণ হল। সে আকাশের দিকে মুখ তুলে গর্জে উঠল, আর মুহূর্তেই প্রবল শক্তি তার ডান বাহুতে কেন্দ্রীভূত হল। তার ডান বাহুর পেশিগুলো ফুলে পাহাড়ের মতো উঁচু হয়ে উঠল, মনে হল যেন বাহুটির আকৃতি দ্বিগুণ বড় হয়ে গেছে। সেই তামাটে পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত আর তাতে আঁকাবাঁকা শিরা ফুলে উঠেছে।

এক প্রচণ্ড গর্জনে মোরিন তার ডান মুষ্টি দিয়ে পায়ের নিচের জমিতে সজোরে আঘাত করল। তার চারপাশে, মোরিনকে কেন্দ্র করে অশান্ত শক্তির ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল।

চারপাশের মাটি শুরু করল পাগলের মতো কাঁপতে, যেন প্রবল ভূমিকম্প হয়েছে। ছুটে আসা উনিশজন এরকম কাঁপা মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, সবাই ধপাস করে পড়ে গেল।

‘‘মরে যা!’’

মোরিন আবার গর্জে উঠল, এবার বাম বাহু তুলে ধরল, পেশি এতটা টানটান যে মনে হয় ক্ষুদ্র পাহাড়। সঙ্গে সঙ্গে সে বাম মুষ্টি দিয়েও জমিতে আঘাত করল।

প্রচণ্ড শক্তি দিয়ে মোরিনকে কেন্দ্র করে আশপাশের শত গজ এলাকা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সেই অশান্তি সরাসরি পড়ল ভূমিতে পড়ে থাকা উনিশজনের শরীরে। তাদের প্রত্যেকের মনে হল বুকে ঘাতক হাতুড়ি পড়েছে। যারা প্রথম স্তরের যোদ্ধা, শক্তি কম তাদের দশজন মুহূর্তেই গুরুতর আহত হল। ছয়জন দ্বিতীয় স্তরের যোদ্ধারও মুখে রক্ত, মুখশ্রী ফ্যাকাশে, কেবল তিনজন তৃতীয় স্তরের যোদ্ধা কিছুটা ভালো অবস্থায় ছিল।

‘‘এখনও শেষ হয়নি!’’

মোরিন ফের আকাশমুখী গর্জনে তার ভেতরের ক্রোধ উগরে দিল, যেন কোনো আদিম দানব চিৎকার করছে। এবার দু'হাত একসঙ্গে তুলে, মাথার ওপরে ধরল এবং—

একসঙ্গে দুই বাহু দিয়ে আবারও প্রচণ্ড আঘাত নামাল!

উনিশজনের দেহ মোরিনের উগ্র শক্তিতে ছিটকে আকাশে উড়ে গেল, চারপাশের শত গজ জমি চুরে-ভাঙচুরে একাকার। যারা আকাশে ছিটকে উঠল, তাদের প্রত্যেকে রক্তবমি করল, এমনকি তিনজন তৃতীয় স্তরের যোদ্ধাও মুহূর্তেই ভয়ানকভাবে আহত হল।

এক এক করে সবাই আকাশ থেকে মাটিতে পড়ল, কেউই আর দাঁড়াতে পারল না, সবাই মৃত কুকুরের মতো পড়ে রইল।

নীরবতা! পুরো প্রাঙ্গণে মোরিনের দম ফেলার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

বেশিরভাগ মানুষের চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে গেছে, তারা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে আছে সেই একমাত্র অবিচলিত ছায়ার দিকে।

ভয়ঙ্কর! শিউরে ওঠার মতো!

মোরিনের ভয়াল শক্তি দর্শকদের আত্মা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়েছে। তার উদ্দাম শক্তি, উন্মাদ আক্রমণ, এসব কোনো সাধারণ মানুষের সাধ্য নয়।

তোনি গলাটা চেপে ধরল, হাতদুটো অজান্তেই কাঁপছে।

মোরিনের এই ভয়ানক রূপ তার মনে চিরস্থায়ী আতঙ্কের জন্ম দিল...

আর তোনির পাশে বসা লুকা, তার মুখের হাসি একেবারে জমে গিয়ে পুরো মানুষটাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়।

‘‘এ কীভাবে সম্ভব? কীভাবে হলো এটা! মোরিন তো নিছক মানুষ, একেবারে সাধারণ মানুষ, তাহলে তার মধ্যে এত উদ্দাম শক্তি আসে কোথা থেকে? তার শক্তি, তার আক্রমণ একেবারে সেই উন্মাদ পশুচারদের মতো! অথচ সে তো মানুষ!’’

লুকার মনে তীব্র ঝড় উঠল।

মানুষ আর পশুচারদের দেহের শক্তির ব্যবধান বিশাল, পশুচারদের শক্তি সাধারণত দুর্দমনীয়, সেটার সঙ্গে মানুষের তুলনা চলে না। মোরিনের এই আক্রমণ কেবল পশুচারদের মতো উদ্দাম শক্তি থাকলেই সম্ভব, সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। এটাই দর্শকদের বিস্ময়।

মোরিন চারপাশে তাকাল, দৃষ্টি পড়ল দূরের ধূসর বর্ম পরা পরীক্ষকের ওপর।

এক ঝটকায় মোরিন কয়েক কদমে পরীক্ষকের সামনে এসে দাঁড়াল।

‘‘তুমি... তুমি কী করতে চাও!’’

ধূসর বর্মধারী পরীক্ষক ভয়ে চেয়ে রইল মোরিনের দিকে। সে জানে, এই ‘‘দানব’’ তার চেয়ে ঢের শক্তিশালী। মোরিনের আগের উন্মাদ আক্রমণ দেখে, তার সামনে দাঁড়িয়ে সে আতঙ্কিত।

‘‘পরীক্ষক, আমি এখন তো ভাড়াটে যোদ্ধার পরীক্ষা পেরিয়ে এসেছি, তাহলে আমি কি এখন থেকে ওটান ভাড়াটে সংঘের একজন?’’ মোরিন হালকা হাসল।

পরীক্ষক একটু থমকে, দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, ‘‘হ্যাঁ, তুমি পরীক্ষায় পাস করেছো। এখন থেকে তুমি আমাদের ওটান ভাড়াটে সংঘের একজন।’’

মোরিন হাসল, তারপর তার দৃষ্টি পড়ল দর্শকাসনের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে সে দেখে ফেলল লুকাকে।

এ মুহূর্তে লুকার মুখে আর সেই সদা হাস্যোজ্জ্বলতা নেই, পুরো মুখটা কঠিন পাথরের মতো।

মোরিন তাকাতেই, দু’জনের চোখাচোখি হয়ে গেল।

লুকার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল, চোখে স্পষ্ট হত্যার আভাস।

এবার সে ভেবেছিল মোরিনকে শাস্তি দেবে, সুযোগ পেলে শেষও করে দেবে। কিন্তু উল্টো মোরিনের জন্যই সে আজ মঞ্চ তৈরি করে দিল। আজকের ঘটনা অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে পুরো ওটান নগরে, তখন মোরিন আরও বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

‘‘ভাগ্যিস... শিক্ষক কিছুদিন আগে অভ্যন্তরীণ নগরে বৈঠকে গেছেন, তাড়াতাড়ি ফিরবেন না। কিন্তু সময় বেশি নেই, ছেলেটাকে আর বড়ো হতে দেয়া যাবে না, শিক্ষকের ফেরার আগেই তাকে শেষ করতেই হবে!’’ লুকা মনে মনে ভাবল।

লুকার সেই কঠিন মুখের দিকে চেয়ে মোরিন কেবল অবজ্ঞাসূচক হাসল, মুখে ফিসফিস করে বলল, ‘‘আমি বলেছিলাম, আর কখনও তোকে হাসতে দেব না। ভালো নাটক তো এখনই শুরু হয়েছে!’’