অধ্যায় চৌদ্দ “স্বপ্ন ছাড়বে না!”

বিনোদনের জগতে আমার সূচনা হয়েছিল একটি গানের মাধ্যমে—'রৌদ্রজ্জ্বল দিন'। কোগুরে ধনেপাতা খেতে পারেনা। 2455শব্দ 2026-02-09 13:14:13

মঞ্চের নিচে দর্শকসারিতে বসে আছে উজিয়া। সে চুপচাপ চেয়ারে বসে, চোখে কোনো উজ্জ্বলতা নেই, যেন সমগ্র মানুষটা প্রাণহীন, অবসন্ন। উজিয়া এই মহানগরীর লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবীর একজন নগণ্য কর্মচারী, প্রতিদিন মুরগির আগে জাগে, কুকুরের পরে ঘুমায়, কেবলমাত্র তিন-চার হাজার টাকা আয় করার জন্য—যেটা কোনোমতে এই প্রথম সারির শহরে বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট, কিন্তু তা কেবল টিকে থাকার জন্যই, বেঁচে থাকার জন্য নয়। মাসের শেষে বেতনের বেশিরভাগটাই চলে যায় বাড়িভাড়ায়, হাতে থাকে মাত্র কয়েকশো টাকা, যা কোনোমতে খাবার জোটাতে পারে।

সম্প্রতি, উজিয়ার সঙ্গে তার চার-পাঁচ বছরের প্রেমিকার বিচ্ছেদ হয়েছে। কারণটা খুবই সহজ—উজিয়ার সঙ্গে থেকে তার প্রেমিকা ভবিষ্যৎ দেখতে পায়নি। সে কষ্ট করতে ভয় পায়নি, বরং একরাশ কষ্টের মাঝেও কোনো আশার আলো দেখতে না পাওয়াতেই সে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। উজিয়া নিজেও এই সত্যটা জানত—এটা তার অক্ষমতা, সামান্য একটু আশার ঝলকও যদি দিতে পারত, তাহলে হয়তো মেয়েটি চলে যেত না। তাই বিচ্ছেদের প্রস্তাবে সে সহজেই রাজি হয়ে গিয়েছিল।

বিচ্ছেদের পর উজিয়া ভেঙে পড়েছিল, এই শহরটায় তার আর কিছুই বাকি নেই বলে মনে হয়েছিল। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয়, শহর ছেড়ে নিজের গ্রামের বাড়ি ফিরে যাবে। বিদায়ের আগে হঠাৎ উপলব্ধি করে—এই বছরগুলোতে সে কখনো নিজের জন্য বাঁচেনি, সবসময় শুধু টিকে থাকার জন্য ছুটেছে। তাই চলে যাওয়ার আগে শহরে একবার ভালো কোনো পারফরম্যান্স দেখে নিজের জন্য একটা সুন্দর স্মৃতি রেখে যেতে চেয়েছিল। ঠিক তখনই সে অনলাইনে ‘কে সংগীতরাজ’ অনুষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখে, বিরলভাবে নিজের জন্য হাজার টাকায় একটা দর্শক টিকিট কিনে ফেলে।

“এরপরের গানটা, উৎসর্গ করছি তাদের, যারা জীবনের পথে কখনো হাল ছাড়েনি, সাহস করে সামনে এগিয়ে চলে।” এই কথাগুলো শুনেই উজিয়ার বুক ধক করে উঠল। একসময় তারও ছিল বুকভরা আশা, এই শহরে নিজের জন্য একটা জায়গা করে নেওয়ার স্বপ্ন, কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম—সে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে।

“‘স্বপ্নপথের নিষ্পাপ হৃদয়’ আপনাদের জন্য।”

গানের শুরুতে বাজল পিয়ানোর সুর। প্রথম কলি গাইতেই উজিয়া বুঝতে পারল—এ গান আগের শিল্পীদের গান থেকে আলাদা। যেন ঝংকার দিয়ে, গলা ছেড়ে, চিৎকার করে গাইছে জৌরান—এতে ছিল অন্যরকম এক আবেগ।

“ফুলে ভরা জগতটা কোথায়?
যদি সত্যিই কোথাও থাকে, আমি সেখানে যাবই।
আমি দাঁড়াতে চাই সেই সর্বোচ্চ শিখরে,
যেখানে কিনা পাথুরে খাড়া দেয়াল, তাও ভয় নেই।”

প্রথম কটি পঙক্তিই উজিয়ার মনে অন্যরকম দাগ কেটে গেল। সে ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিল না, কিন্তু মনে হচ্ছিল, সে নিজেকে গানের ভেতর হারিয়ে ফেলছে।

“শেষ বিন্দু শক্তি দিয়ে বাঁচো, ভালোবাসো,
প্রয়োজনে আত্মত্যাগ করো।
কারো সন্তুষ্টি চাই না, শুধু নিজের কাছে সৎ থাকো।
আদর্শের পথ ছেড়ে কখনো পিছু হটিনি,
মলিন দিনেও আশা ছাড়িনি।”

এই পর্যায়ে গান চলাকালীন উজিয়ার মনে পড়ে গেল, কেন সে এই শহরে এসেছিল। কয়েক বছর আগে, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে, প্রেমিকাকে সঙ্গে নিয়ে সে এসেছিল এই মহানগরীতে, শুরুটা ছিল আরও কঠিন। থাকার মতো ঘরও ছিল না, দুজনে রাতে ফাস্টফুড রেস্তোরাঁয় ঘুমাত, আশপাশের লোকজন কৌতূহলী চোখে তাকালেও ভয় পেত না। বরং তখন ছিল বুকভরা স্বপ্ন, আশার আলো, একদিন বড় কিছু হওয়ার প্রত্যয়।

চাকরি পেয়ে উজিয়া সেই সুযোগটা আঁকড়ে ধরেছিল, সহকর্মীরা যা ফেলত, সে সব নিজে করত, একদিন মালিকের নজরে পড়ার আশায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, প্রতিদিনের ক্লান্তি, অবসাদ তার সব স্বপ্ন নিঃশেষ করে দিয়েছিল। কেবল দিন গুজরান, সামান্য টিকে থাকার লড়াই—এটাই হয়ে উঠেছিল জীবন। তার এই অবস্থা প্রেমিকার সঙ্গহীনতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজ, জৌরানের গান শুনে আবারো মনে পড়ে গেল তার পুরোনো স্বপ্ন, তার আশা।

মঞ্চে গান গাইতে গাইতে জৌরান নিজেও যেন উত্তেজনায় ডুবে গিয়েছিল, গলা খুলে চিৎকার করে গাইতে লাগল। এই মঞ্চে নিজের আবেগ উজাড় করে দেওয়াই তার লক্ষ্য ছিল, এবং সেই সঙ্গে নিজেকে আবারো মনে করিয়ে দেওয়া—আদর্শ ভুলে যেও না, সাহস করে এগিয়ে চলো।

“পেছনে না তাকিয়ে ছুটে চলো, কটূক্তি আর উপহাসের মুখোমুখি হয়ে,
জীবনের বিশালতা না বুঝলে, সংগ্রামের স্বাদ পাওয়া যায় না।
ভাগ্য আমাদের হাঁটু গেড়ে ভিক্ষা চাইতে বাধ্য করতে পারে না,
রক্তে ভেজা বুকে নিয়েও এগিয়ে চলতে হয়।”

দর্শকসারিতে বসে থাকা বাইনিংয়ের কৌতূহল জৌরানকে ঘিরে আরও গভীর হয়ে উঠল। প্রথমে সে ভেবেছিল, জৌরান বুঝি জন্মগত প্রতিভাবান, যাকে জীবনে কোনো বাধা ছুঁতে পারেনি। কিন্তু পরে জেনেছে—জৌরানও একসময় সংগ্রামী শিক্ষানবিশ ছিল, একা একা বছরের পর বছর পরিশ্রম করেছে।

এই গান দিয়ে জৌরান দর্শকদের বলতে চায়—কখনো গুজব, কদর্য মন্তব্যে স্বপ্ন ছেড়ে দিও না, দমিয়ে যেও না। উপস্থিত শ্রোতারা একে একে গানের আবেগে ডুবে গেল। তাদেরও আছে নিজস্ব দুঃখ, ব্যর্থতা, কটু কথা শোনা—

“এতদিনেও তোমার সংগীত-স্বপ্নের কোনো ফল দেখিনি।”
“ছেড়ে দাও, তুমি ওর সমান হতে পারবে না।”
“হার মেনে নাও, এসব আদর্শের পেছনে ছুটে কী লাভ?”

জৌরানের গান শ্রোতাদের নতুন উদ্যম দিলো, অনেক দিনের চেপে রাখা আশা আবার জেগে উঠল।

যৌবনের দিনগুলোতে, কে-ই বা নির্ভয়ে হাতে তলোয়ার তুলে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখেনি? কে-ই বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়নি? কেবল নির্মম বাস্তবতার চাপে সবাইকে ছাড়তে হয় সে স্বপ্ন। আজ জৌরান তাদের সেই পুরোনো স্বপ্নগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলল।

জীবনে কখনো সবসময় সহজ পথ থাকে না, বারবার বাধা, ব্যর্থতা এসে পড়ে। ছাড়িয়ে যাওয়া সহজ, কিন্তু সত্যিকারের সাহসিকতা লাগে টিকে থাকার জন্য। শেষটা যেমনই হোক, অন্তত গর্ব করে বলা যাবে—আমি চেষ্টা করেছিলাম, কোনো লজ্জা নিয়ে বলতে হবে না—আমি হাল ছেড়েছিলাম।

দেশের অগ্রগামী যাঁরা, তারাও কখনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাননি, তবুও হাল ছাড়েননি। একের পর এক অগ্রজ, সাহস নিয়ে এগিয়ে গেছেন—মাথা ফাটলেও, রক্ত ঝরলেও থামেননি। এদের কারণেই আজকের সুখের জীবন, সুন্দর গল্পগুলোর জন্ম।

গানের শেষে জৌরান আর কোনো কৌশল মানল না, গলা ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল—

“ছুটে চলো, নিষ্পাপ হৃদয়ের গর্ব বুকে নিয়ে,
জীবন তখনই জ্বলে ওঠে, যখন শেষ পর্যন্ত লড়াই চলে।
অবশিষ্ট জীবন হীনভাবে টেনে না, বরং আগুনের মতো জ্বলো,
বুকের গভীরে লালিত স্বপ্নের জন্য,
সমঝোতা নয়, শেষ বয়স অবধি লড়ো।”

গানের চূড়ান্ত মুহূর্তে জৌরান গলা ভেঙে চিৎকার করে উঠল—কিন্তু এই চিৎকারটাই গানটিকে প্রাণ দিল, যেন সর্বশক্তি দিয়ে ছুটে চলার অনুভূতি প্রকাশ পেল।

দর্শকরাও একযোগে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠল।
উজিয়া, বহুদিনের হারানো স্বপ্ন আবারও জেগে উঠতে দেখল নিজের মধ্যে। সে আর চলে যেতে চায় না, সে হাল ছাড়তে চায় না, আবার চেষ্টা করবে। বহু বছরের সঙ্গিনীকেও আর হারাতে চায় না—অনুষ্ঠান শেষেই ফোন করবে মেয়েটিকে; এইবার আর কাউকে হতাশ করবে না।